১০ অক্টোবর, ২০২২ ০৯:৫৩ পিএম

দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসায় মুক্তি মিলবে মানসিক রোগের 

দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসায় মুক্তি মিলবে মানসিক রোগের 
যখন কোনো মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্ম, পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিকতা ব্যাহত হয়, এবং এটির সঙ্গে শারীরিক কোনো রোগ থাকে না, তখন এটিকে মানসিক ব্যাধি বলে।

আসাদুল ইসলাম দুলাল: একটা সময় মানুষ মনে করতো, মানসিক রোগ বলতে কিছু নেই। তবে ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। মানসিক অসুস্থতাকে এখন সবাই রোগ হিসেবে শিকার করছে, কিন্তু এ রোগে আক্রান্তদের অনেকেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে আগ্রহী নয়। পরিণামে দিন দিন বেড়েই চলছে এই রোগীর সংখ্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক অসুস্থতা মানে পাগল হওয়া নয়, চিকিৎসায় নিরাময় হয় এই রোগ। মানসিক রোগের বিষয়ে আরো সচেতন হতে হবে। জোরদার করতে হবে স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশে সাত থেকে ১৭ বছর বয়সের শিশুদের ১৪ শতাংশ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ মানসিক রোগে ভুগছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টের সভাপতি অধ্যাপক ডা. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমরা যদি মানসিক এবং সামগ্রিকভাবে নিজের দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত কাজ সঠিকভাবে করতে পারি, পরিবারের ও সামাজিক কাজে সহযোগিতা করতে পারি, তখনই বলবো আমরা মানসিকভাবে সুস্থ আছি। আর যদি অন্যের সাহায্যে  এগিয়ে না আসে, সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করতে না পারে, তাহলে একজন মানুষকে মানসিকভাবে সুস্থ বলা যাবে না। এজন্য মানসিকভাবে সুস্থ ব্যক্তিরা সবসময় নিজের এবং অন্যের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেন।’

রোগের কারণ জানতে চাইলে ডা. ওয়াজিউল আলম বলেন, ‘এটা জেনেটিক কারণে হতে পারে,পারিবারিক, সামাজিক ও মস্তিষ্কজনিত কিছু জৈব রাসায়নিকের তারতম্য হওয়ার কারণে মানসিক সমস্যা হয়। এ ছাড়া আধুনিক যুগে পরিবেশ পরিস্থিতি মানুষের প্রতি মানসিক চাপ সৃষ্টি করে থাকে। মানসিক চাপ ও পরিবেশগত চাপ মানসিক রোগের অন্যতম একটি বিশেষ কারণ।’

লক্ষণ

মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তিদের লক্ষণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘একজন লোক মানসিকভাবে সুস্থ কিংবা অসুস্থ খুব সহজে বুঝা যায় না। অনেক মৃদু রকমের মানসিক রোগ আছে, যেগুলো খুব সহজে ধরা পড়ে না, যেমন-অ্যাংজাইটি, হালকা বিষণ্ণতা। আমরা যদি লক্ষ করি যে, দৈনন্দিন জীবনের ক্রিয়াকলাপ, আচার-আচরণ এগুলো ক্রমশ পরিবর্তন হচ্ছে। এত সে নিজেও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এবং অন্যের ক্ষতির কারণ হচ্ছে। এটি নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে বেশি দিন থাকছে। তখন মানিক রোগ হয়েছে বলে আমরা মনে করি। যেমন-একটি লোক হয়তো বেশি কথা বলছে, রাগ বেশি করছে, বেশি টাকা খরচ করছে, অন্যের সঙ্গে বেশি খারাপ কাজ করছে। এটা দুই-তিনদিন হয়তো অন্যরা মেনে নিবে, কিন্তু এটি যদি ক্রমাগতভাবে দুই মাস ধরে অব্যাহত থাকে, তখন এটিকে আমরা মানসিক রোগ বলি।’

মানসিক রোগীকে মোটাদাগে দুইভাগে ভাগ করা হয়। যেমন- মৃদু  ও মাঝারি বা তীব্র আকারের মানসিক রোগ। মৃদু রোগী হলো-অ্যাংজাইটি, মন খারাপ, নিদ্রার সমস্যা ও কিছুটা বিষণ্ণতা। এতে রোগীর খুব বেশি অসুবিধা হয় না। তীব্র আকার রোগী যারা, তাদের জ্ঞান লোপ পায়, আচরণ অত্যান্ত রুঢ় হয়ে যায়, অনেক সময় ভাঙচুর করে। এ সময় অনেক অভিভাবক রোগীকে চিকিৎসার জন্য না এনে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে। এটি ঠিক নয়।’

চিকিৎসা কেন্দ্র

দেশে মানসিক রোগের অনেকগুলো চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে জানিয়ে এই সাইকিয়াট্রিস্ট বলেন, ‘এ রোগ সঠিক সময়ে নির্ণয় করে চিকিৎসা করলে ভালো হয়ে যায়। এ জন্য দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। অধিকাংশ মানসিক রোগীই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়। সরকারি-বেসরকারি উভয় হাসপাতালে চিকিৎসার সু-ব্যবস্থা রয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় চিকিৎসা কেন্দ্র হচ্ছে পাবনা ৫শ’ শয্যা বিশিষ্ট মানসিক হাসপাতাল, ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) আলাদা মানসিক রোগীর চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে। দেশের প্রায় প্রতিটি মেডিকেলে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা ইউনিট রয়েছে, যেখানে এই রোগের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়।’

এদিকে, বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম জোরদার করতে হবে উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভাইস চ্যান্সেলর জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের পক্ষ থেকে অধিক সংখ্যক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ তৈরি করা হচ্ছে। এজন্য এ বিষয়ে উচ্চতর কোর্সে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি চিকিৎসা সেবা বাড়াতে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রোগটির বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. ফাতিমা জোহরা মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের মস্তিষ্কের ফাংশনাল পার্ট হচ্ছে মন। যার মাধ্যমে বিভিন্ন রকমের রাসায়নিক পদার্থের সমন্বয়ে মস্তিষ্কের ফাংশনাল পার্ট হয়। সেক্ষেত্রে মানসিক রোগ তখনই হয়, যখন মস্তিষ্কের পদার্থগুলোর তারতম্য হয়ে মানসিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্থ করে।’

মস্তিষ্কের মানসিক প্রক্রিয়াগুলো হচ্ছে- ‘মানুষের চিন্তা, মেজাজ, আচরণ, আবেগ, অনুভূতি ও কোনো কিছু উপলব্ধি করা। যখন আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম, পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিকতা ব্যাহত হয় এবং এটির সঙ্গে শারীরিক কোনো রোগ থাকে না, তখন তাকে মানসিক ব্যাধি বলে।’

রোগের কারণ সম্পর্কে অধ্যাপক ডা. ফাতিমা জোহরা বলেন, এটা বিভিন্ন কারণে হয়। জেনেটিক বা বংশগত কারণে হতে পারে। কোনো ধরনের ট্রমার পরে মানসিক রোগ হতে পারে। যেমন-কারও বাবা-মা মারা গেলে, চাকরি হারালে, পরীক্ষায় ফেল করলে, মামলা জটিলতায় পড়লে ও অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দিলে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। অনেকে ক্রিমিনাল মানসিকতার কারণে এ রোগে আক্রান্ত হন। এ ছাড়াও বায়োলজিক্যাল ও মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগের কারণে মানসিক সমস্যা হয়।

দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ

মানসিক রোগ থেকে মুক্তির উপায় সম্পর্কে এই সাইকিয়াট্রিস্ট বলেন, ‘এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে হলে চিকিৎসার আওতায় আসতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাধিগুলো সম্পর্কে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ভ্রান্ত বিশ্বাস রয়েছে। অনেকে মনে করেন এ রোগ সারা জীবনের জন্য হয় অথচ সঠিকভাবে চিকিৎসা গ্রহণ করলে কিছু রোগ ছাড়া অধিকাংশই দুই বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। পরিবারের কারও যদি সিজোফ্রেনিয়া বা গুরুতর বাইপোলার রোগ আছে, তাদের ক্ষেত্রে একটু সতর্ক হয়ে থাকতে হবে। কারো যদি ঘুমের সমস্যা হয়, অতিরিক্ত কথা বলে অথবা ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন আসে তাহলে শিগগিরই চিকিৎসা নিতে হবে। এক্ষেত্রে তারা খুব সহজে এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে পারে।’

সামাজিক কুসংস্কারের বিষয়ে ডা. ফাতিমা বলেন, ‘২০১৮-১৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য সমীক্ষায় দেখা গেছে- বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে মানসিক রোগে ভুগছেন। কিন্তু আক্রান্তদের অধিকাংশ চিকিৎসকের কাছে আসে না। দুই থেকে তিনভাগ লোক চিকিৎসকের কাছে আসলেও ভ্রান্তি, ভুল ধারণা বা এই রোগ সম্পর্কে না জানার কারণে চিকিৎসা না নিয়ে চলে যান। অর্থাৎ কুসংস্কারের ফাঁদে পা দেন তারা।

তারা মনে করেন, মানসিক রোগীরা কোনোদিন ভালো হয়না। এটা হয়তো জীনের আছর কিংবা কোনো পাপের বা খারাপ কাজের ফল। এ কারণে অনেক রোগী কবিরাজের কাছে চলে যান। পরবর্তীতে রোগ অনেক জটিল হয়ে যায়। একটা রোগ প্রথম দুই বছরের মধ্যে শনাক্ত হলে ৭০ শতাংশ ভালো হয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘কবিরাজি চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেক সময় নারী ও প্রতিবন্ধী শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। তাদেরকে বিভিন্ন কবিরাজি চিকিৎসার মাধ্যমে শোষণ করা হয়। এসব ঝাঁড়-ফুকের মাধ্যমে ভুক্তভোগী রোগীদের পরিবারের স্বজনদের কাছ থেকে অনেক টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এসব ভ্রান্ত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

সহানুভূতি প্রকাশ

মানসিক রোগীর সঙ্গে আচরণ কেমন হবে জানতে চাইলে এই চিকিৎসক বলেন, ‘আমাদের দেশে মানসিক রোগীর সঙ্গে খু্ব খারাপ আচরণ করা হয়। মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে সমাজ ও পরিবার থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়। এটি উচিৎ নয়। এ রোগ যে কারো হতে পারে। মস্তিষ্কের এই সমস্যা শারীরিক ব্যাধির মতো একটি অসুখ। মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাধি নিয়ে অনেক ভুল ভ্রান্তির অবসান হয়েছে।’

মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাধি সম্পর্কে অনেক প্রচারণা হচ্ছে। যেমন-এবারের মানসিক স্বাস্থ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- ‘সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতাকে বিশ্বব্যাপী অগ্রাধিকার দিন’ এ জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রোগীদের পাগল বলে চিহ্নিত না করা, এক ঘরে না করা। তাদের সাথে আচারণটা এমন হবে যে, এটা একটি রোগ, এটির চিকিৎসা করাতে হবে। তাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার ও সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতে হবে’, যোগ করেন ডা. ফাতিমা জোহরা।

এএইচ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক